Logo
Logo
×

রাজনীতি

ঐকমত্য কমিশনের আলোচনা

প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ নিয়ে একাধিক প্রস্তাব

Icon

ঢাকা টুডে ২৪ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৫, ০৫:২৮ এএম

প্রধান উপদেষ্টার নিয়োগ নিয়ে একাধিক প্রস্তাব

নির্বাচনকালীন একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একমত। তবে এই সরকারের প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন বা কীভাবে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ পাবেন, তা নিয়ে দলগুলো এখনো একমত হতে পারেনি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় এ–সংক্রান্ত একাধিক প্রস্তাব উঠে এসেছে। প্রস্তাবগুলো নিয়ে আরও আলোচনা হবে।

একসময় সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধান ছিল। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এটি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছিল। পরে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আদালতের রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যবস্থাটি বাতিল করা হয়।

গত বছরের ডিসেম্বরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বিলুপ্ত করা–সংক্রান্ত পঞ্চদশ সংশোধনী আইনের দুটি ধারা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে বাতিল ঘোষণা করেন হাইকোর্ট। তত্ত্ববধায়কব‍্যবস্থা বাতিলের আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক ও এক ব্যক্তি পৃথক রিভিউ আবেদন করেছেন। আবেদনগুলো শুনানির অপেক্ষায় আছে।

তবে সংবিধান সংস্কার কমিশন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে যুক্ত করার সুপারিশ করেছে। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে প্রথম পর্বের আলোচনায় সব কটি দল একমত হয়েছে যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু একটি–দুটি ছাড়া অন্য দলগুলো কমিশনের কাছে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সুনির্দিষ্ট রূপরেখা উপস্থাপন করেনি। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন বা কীভাবে হবেন, সেটা নির্ধারণ করা জরুরি। প্রধান উপদেষ্টাই উপদেষ্টা পরিষদের অন্য সদস্যদের মনোনীত করবেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, আইনসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বা আইনসভা ভেঙে গেলে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার শপথ না নেওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ হবে সর্বোচ্চ ৯০ দিন। প্রধান উপদেষ্টাসহ সর্বোচ্চ ১৫ জন সদস্য নিয়ে কাজ করবে উপদেষ্টা পরিষদ। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবে নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনসভা—এই তিন অঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি)।

তবে ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে দলগুলোর দ্বিতীয় পর্বের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে এনসিসি গঠনের প্রস্তাব থেকে সরে আসে কমিশন। এর বদলে তারা সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের জন্য একটি কমিটি গঠনের প্রস্তাব আসে। এনসিসি না থাকায় সংবিধান সংস্কার কমিশন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের যে রূপরেখা প্রস্তাব করেছিল, তা আর আলোচনায় রাখা হয়নি।

সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী মাধ্যমে যেভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছিল, সেই রূপরেখা গতকালের আলোচনায় উপস্থাপন করা হয়। তবে এটি কমিশনের প্রস্তাব ছিল না। এ ছাড়া প্রথম পর্বে আলোচনার মাধ্যমে আসা একটি এবং নাগরিক সমাজের একটি প্রস্তাব আলোচনার জন্য তোলা হয়। আলোচনায় আরও কিছু বিষয় ওঠে আসে।

সংবিধানে যা ছিল

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ৫৮(গ) ধারায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান যুক্ত করা হয়েছিল। তাতে বলা হয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে এই সরকার হবে। উপদেষ্টা থাকবেন সর্বোচ্চ ১০ জন। প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে পরামর্শ করে রাষ্ট্রপতি অন্য উপদেষ্টাদের নিয়োগ দেবেন।

প্রধান উপদেষ্টা কে হবেন, তা সংবিধানে নির্ধারণ করে দেওয়া ছিল। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হবেন প্রধান উপদেষ্টা। যদি এটি না হয় তাহলে তাঁর আগে অবসরে যাওয়া সর্বশেষ প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করা হবে। যদি কোনো অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি পাওয়া না যায় বা দায়িত্ব নিতে রাজি না হন, তাহলে আপিল বিভাগের সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি হবেন প্রধান উপদেষ্টা। এটিও না হলে তার আগে অবসরে যাওয়া বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করা হবে। যদি আপিল বিভাগের কোনো অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকেও পাওয়া না যায়, তাহলে রাষ্ট্রপতি প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে একজন যোগ্য নাগরিককে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করবেন। এটাও সম্ভব না হলে রাষ্ট্রপতি নিজে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন।

গতকাল বুধবার দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় বিধানটি উপস্থাপন করা হয়েছিল। তবে আলোচনায় দেখা যাচ্ছে, হুবহু আগের বিধান ফিরিয়ে আনার বিষয়ে দলগুলোর মধ্যে মতভিন্নতা আছে। বিএনপি, এনসিপিসহ বেশ কয়েকটি দল বিচার বিভাগকে এই প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখার পক্ষে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীসহ বেশির ভাগ দল কোনো পর্যায়ে গিয়ে রাষ্ট্রপতিকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব দেওয়ার বিপক্ষে। তবে বিএনপি মনে করে, সর্বশেষ বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্রপতির বিষয়টি বিবেচনা করা যায়। কারণ, আগামী দিনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন হবে গোপন ব্যালটে, এ বিষয়ে অনেকটা ঐকমত্য হয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সুপারিশ

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ২০ সদস্যের একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার সুপারিশ করেছিল। তারা সাংবিধানিক কাউন্সিলের সুপারিশ গৃহীত না হলে রাজনৈতিক দল, বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজ ও সমাজের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠনের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি রূপরেখা প্রণয়নের সুপারিশ করেছিল। তাদের এই প্রস্তাব নিয়ে এখন পর্যন্ত সেভাবে আলোচনা হয়নি।

এনসিপির প্রস্তাব

গত ২৫ মে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ঐকমত্য কমিশনের কাছে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটি রূপরেখা প্রস্তাব করেছিল। তাদের প্রস্তাবে বলা হয়, আইনসভার নিম্নকক্ষ তথা সংসদ ভেঙে দেওয়ার অন্তত তিন সপ্তাহ আগে ১১ সদস্যের একটি সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা হবে। প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে সর্বদলীয় কমিটিতে সংসদীয় দলগুলোর সদস্যসংখ্যা নির্ধারিত হবে। সংসদীয় কমিটিতে সদস্য অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে যেকোনো দলকে ন্যূনতম ৫ শতাংশ ভোটের অধিকারী হতে হবে।

আইনসভার যেকোনো কক্ষের (উচ্চকক্ষ বা নিম্নকক্ষ) সদস্য এই কমিটির সদস্য হওয়ার যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। সরকারি দল, প্রধান বিরোধী দল ও অন্যান্য বিরোধী দল নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তিনজন করে মোট ৯ জন নির্দলীয় প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে পারবে। কোন দল কোন কোন ব্যক্তির নাম প্রস্তাব করেছে, জনগণের কাছে তা খোলাসা করতে হবে।

প্রস্তাবিত নামগুলো থেকে একটি নাম চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটির কাছে পাঠানো হবে। কমিটি ৮-৩ ভোটে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে একজন ব্যক্তির নাম চূড়ান্ত করবে।

এই প্রক্রিয়ায় প্রস্তাবিত নামগুলো থেকে একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করা না গেলে উচ্চকক্ষ ‘র‍্যাঙ্কড চয়েস ভোটিং’ (ক্রমানুসারে পছন্দ বা অগ্রাধিকারভিত্তিক পদ্ধতিতে) প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচন করবে।

ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় পর্বের আলোচনায় এনসিপির এই প্রস্তাবও আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করেছে কমিশন। কোনো কোনো দল এনসিপির এই প্রস্তাবকে মোটামুটি সমর্থন করছে। যেমন বাংলাদেশ জাসদের মুশতাক হোসেন গতকালের আলোচনায় বলেছেন, এনসিপির প্রস্তাবের কাছাকাছি যাওয়া যায়।

ঢাকা টুডের একটি প্রকাশনা

অনুসরণ করুন